| |

ওরা বাচতে দিলনা আমার পরিবার টিকে

মাহফুজুল আলম খোকন: আল্লাহ তুমার গায়েবি মদদে আমার একটি সন্তানকে হলেও বাচিয়ে দাও। আপনারা একটু দেখেন আমার বড় মেয়েটা মনেহয় এখনো বেচে আছে। ওরা বাচতে দিলনা আমার পরিবার টিকে। ওদের লালশার শিকার হয়েছে আমার স্ত্রী সন্তানেরা। এখন আমি কি নিয়ে পৃথীবিতে বেচে থাকবো..?। বৃহস্পতিবার গভির রাতে রাজধানীর তুরাগ থানাধীন কালিয়ারটেক এলাকার সানভিম স্কুলের পিছনের নিজ বাড়িতে স্ত্রী সন্তানদের লাশের পাশে এভাবেই বুক চামড়ে কাঁদছিলেন গৃহকর্তা মোঃ মোস্তফা কামাল।

বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১১ টা থেকে ১২টার মধ্যে নিজ কক্ষে দরজা লাগিয়ে ঘুমন্ত ১১ মাসের শিশু সাদ,ছোট মেয়ে জান্নাতুস শেফা (৮) ও বড় মেয়ে শান্তা আক্তার (১৩) কে হত্যার পর পাশের রুমে ফ্যানের সাথে ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করেন ‘মা’ রেহানা বেগম (৩৮)। নিহত রেহানার স্বামী মোস্তফা কামাল কান্নাজরিত কন্ঠে বলতে থাকেন,আমি ইফতারের পর নামাজ পরে বাসাথেকে অফিসের উদ্যেশ্যে বেড়িয়ে যাই, ১২ টার কিছু সময় পর এসে দরজায় নক করলেও কোনরকম সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে দরজা খোলে ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখি বিছানায় পড়ে আছে সন্তানদের নিথর দেহ, পাশের রুমে স্ত্রী রেহানার ঝুলন্ত লাশ।

খবর পেয়ে তুরাগ থানার ইন্সপেক্টর অপারেশন মোঃ দুলাল মিয়া সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌছান। পরে উত্তরা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) শাহেন শাহ মাহমুদ,তুরাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহাবুবে খোদা ও পশ্চিম থানার ওসি অপারেশন মোঃ শাহ-আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নিহত রেহানার বড় ভাই মাহবুব আলম সাগর বলেন, ভগ্নিপতি ফোন করে জানায় বোন ও তার সন্তানদের মৃত্যুর খবর। অপর দিকে সাগর অভিযোগ করে বলেন, কামালের মা, ভাই-বোন তার সম্পত্তি দখলের জন্য দীর্ঘদিন যাবত আমার বোনের উপর অত্যাচার করে আসছিল। অবশেষে তা সইতে না পেরে বোন তার সন্তানদের নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে।

বোনের সংসারে অভাব থাকায় মাঝে মধ্যেই আমি বাজার সদাই করে দিয়ে যেতাম। তিন দিন আগেও আমি বোনের বাসায় বাজার দিতে এসে জানতে পারি এই রোজার মাসেও নাকি শুধু লাউশাক রান্নাকরে তাদের দিন চলছে। তখন আমি বাজার সদাই করে দশটা মুরগী তিন কেজি গরুর মাংস নগদ কিছু টাকাও দিয়ে গেছিলাম। বলেছি ঈদের আগে আরেকবার এসে জামাকাপড় ও বাজার সদাই করে দিয়ে যাব। বোন জামাই কামাল গার্মেন্টর্স এ জি এম হিসেবে চাকরি করতো,বিদেশে যাওয়ার জন্য চাকরিটা ছেড়ে দেয়। পরে বিদেশে যেতে না পারায় সেই টাকায় ৫ কাঠার উপরে এই বাড়িটি নির্মান করেন কামাল।

জায়গাটি যৌথ মালিকানা সম্পদ হওয়ায় গত কয়েক বছর যাবৎ কামালের মা, বোন ও মেঝো ভাই ওই জায়গা দখল করে ভাড়া উত্তোলন করতে থাকায় অনটনে পরে আমার বোনের পরিবার । এই বাড়িটি নির্মানে কামালের আয়েরে সকল টাকাই ব্যায় করেফেলায় বাড়ি ভাড়াই ছিল কামালের আয়ের এক মাত্র উৎস। তাদের ওই বাসা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন যাবৎ। গত কয়েক মাস আগে কামালের মা ও ভাই-বোন চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে ১২ লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছে,কিন্তু কামালকে একটি টাকাও দেয় নি তারা।

বোনের বড় মেয়ে শান্তা ১৬ তে পিএসসি দেয়ার কথা থাকলেও নিবন্ধনের টাকার জন্য পরিক্ষা দিতে পারেনি, ১৭ আবারো পরিক্ষার্থী ছিল সে। এত কষ্টের মধ্যে থেকেও বোন আমাদের কিছুই বুঝতে দেয় নি। সরাসরি কখনো আমাদের কিছুই বলে নি। ঘটনার বিষয়ে জানতে কামালের ভাই,বোন,বা মা কাউকেই পাওয়া না যাওয়ায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি ও কামালের মানসিক অবস্থা ঠিক না থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

উপরোক্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তুরাগ থানার ওসি মাহবুবে খোদা ক্রাইমবাংলাকে জানান,ওই ঘরে ভেতর থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল বলে বাড়ির মালিক কামালের কাছ থেকে জানতে পারি। তবে লাশের গলায় দাগ দেখে মনে হচ্ছে সন্তানদের হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছে। তিনি আরো জানান, সুরতহাল রিপোর্ট শেষে ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আমরা দুটি কারণ পেয়েছি,একটি হল সংসারের অভাব অনটন এবং অপরটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ। কামালের মা, ভাই বোনদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এ বিরোধ চলে আসছিল।এই ঘটনায় মামলা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিহতের স্বজনরা মামলা বা অভিযোগ দিলে তার পর প্রয়োজনিও ব্যাববস্থা নেয়া হবে। আপাদত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।

উপরোক্ত বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) শাহেন শাহ মাহমুদ ক্রাইমবাংলাকে জানান,বহিরাগত কেউ হত্যা করেছে এমন কোন আলামত আমরা পাইনি। প্রাথমিকভাবে দেখে মনে হচ্ছে, তিন সন্তানকে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই বিস্তারিত জানা যাবে।