| |

নিশ্চিত করতে হবে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

বিদেশে পনের বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছি– তবু বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা মনে হয় একটুও কমেনি, বরং বেড়েছে। এই যে প্রতিদিনের এত ব্যস্ততা, তারপরও দেশের খবর জানার জন্য প্রায় প্রতি মুহূর্তে উদগ্রীব থাকি। মাঝেমধ্যে দেশ থেকে এমন সব দুঃসংবাদ পাই যে, নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। ভেতরে ভেতরে একেবারে তছনছ হয়ে যাই।

বনানীর রেইন ট্রি হোটেলে সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণের খবরটা শোনার পর থেকেই খুব অস্থির হয়ে রয়েছি। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ঘটনার বর্ণনা পড়ছি আর শিউরে উঠছি। বারবার মনে হচ্ছে, এই কি মানুষজন্ম? পশুরাও তো এতটা পাশবিকতা জানে না।

বাংলাদেশে ধর্ষণ নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন দেশের আনাচে-কানাচে কত তরুণী ধর্ষিত হচ্ছে, তার কতটুকুই-বা আমরা জানতে পারছি? লোকলজ্জা, বিচারহীনতা আর কলংকের ভয়ে এই সমাজে ধর্ষিতারা মুখ বুজে সব সয়ে যান। পুরুষশাসিত অমানবিক এই সমাজে আমরা বরং তাদেরই অসংখ্য প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাই।

এইসব নির্মমতার প্রতিবাদে কালেভদ্রে হয়তো গাজীপুরের হযরত আলীর মতো হতভাগ্য কোনো পিতা তার কন্যাশিশুর ধর্ষণের বিচার না পেয়ে কন্যাসহ আত্মঘাতী হন। কখনও কখনও হয়তো কোনো এক ধর্ষিতা তরুণী সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। সমাজের একাংশের মধ্যে তখন একটা সাময়িক আলোড়ন তৈরি হয়। তবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের তাতে মনে হয় কিছু যায় আসে না। এক ধরনের অদ্ভুত নির্বিকারতা পেয়ে বসেছে আমাদের। যতক্ষণ কোনো সমস্যা নিজের কাঁধে এসে না পড়ছে ততক্ষণ যেন কারও মাথাব্যথা নাই। যেন ‘চারিপাশ চুলোয় যাচ্ছে যাক আমি ভালো থাকলেই হল’। এসব কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা পার পেয়ে যায়, আইনের আওতায় আসে না।

তবে এবারে যাদের বিরূদ্ধে বনানীর রেইন ট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তারা আর দশজন ধর্ষকের চেয়ে দুর্ধর্ষ, আলাদা। ধর্ষণকালীন তাদের ঔদ্ধত্য আমাদের দেশের শাসন ব্যবস্থাকে পর্যন্ত অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সূত্রমতে, আপন জুয়েলার্সের মালিকের সন্তান শাফাত আহমেদ ধর্ষণের সময় চীৎকার করে বলতে থাকে, “এই দেশের এয়ারপোর্টের সব সোনা কই যায়? কইত্থেইকা আসে? সব আমার বাপের আন্ডারে।” তার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে, তার পিতা, আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক সোনা ব্যবসার আড়ালে আদতে একজন বড় মাপের সোনা চোরাচালানী। সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উচিত হবে বিষয়টি নিয়েও তদন্ত করা।

ধর্ষক সাফাত আহমেদ নির্যাতিত তরুণীদের খুন করার ভয় দেখিয়ে বলেছে, এর আগেও সে অনেক মানুষকে খুন করেছে। তদন্তসাপেক্ষে এইসব খুনেরও বিচার হওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই তরুণীকে নির্যাতনকালীন যেসব ভাষায় গালাগালি করেছে, তাতে এই ধর্ষকদের আদ্যন্ত নিয়েই আমাদের সংশয় জাগে।

এই যে গুলশানের আলিশান বাড়ি, সোনা ব্যবসা ও সোনা চোরাচালানীর অঢেল টাকা– কী হবে এসব দিয়ে? নিজের সন্তান যদি নেশাখোর-ধর্ষক হয়। এহেন সন্তানের পক্ষে সাফাই গাইতেও লজ্জা করে না এসব কালো টাকার মালিক, তথাকথিত ব্যবসায়ীদের? অবৈধ সম্পত্তি আর প্রভাব প্রতিপত্তির দাপটে এরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। প্রচলিত আইনের পরোয়া করে না। কোনো অপরাধে এদের আদৌ শাস্তি হবে কী না তা নিয়ে তাই সাধারণ মানুষের ভেতরে এক ধরনের সংশয় কাজ করে সবসময়।

তবে আইনের প্রতি আস্থা হারানোয় সাধারণ মানুষের মঙ্গল নেই। তার চেয়ে বরং সামাজিকভাবে এইসব অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বর্জন করা উচিত। ইতোমধ্যেই ঢাকায় ক্রেতাদের মধ্যে আপন জুয়েলার্সের পণ্য বর্জনের হিড়িক উঠেছে। আমজনতার পক্ষে এটি একটি শুভ উদ্যোগ এবং প্রতিক্রিয়াও সুদূরপ্রবাসী।

এই ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি পলাতক নাঈম আশরাফ, যার প্রকৃত নাম হালিম। সিরাজগঞ্জের দরিদ্র ঘরের সন্তান হালিম ঢাকায় এসে হয়েছে এক মস্ত টাউট। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সেলফি তুলে, একের পর এক মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কী অনায়াসে নানা মানুষের সঙ্গে দিব্যি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয় না। সময়ের পরিক্রমায় এইসব হালিমদের মতো একটা টাউট শ্রেণি গড়ে উঠেছে ঢাকায়। আপাদমস্তক মিথ্যা আর প্রতারণায় ভরপুর এদের হাতে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। এদের ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক হতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শরণাপন্ন হতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সেই দুই তরুণীকে অভিনন্দন। অবশেষে সব ভয়, হুমকি মোকাবেলা করে তারা ধর্ষকদের বিরূদ্ধে মামলা করেছেন। সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। যদিও তাদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র এখনই থেমে যাবে বলে মনে হয় না। জনমত বিভ্রান্ত করার জন্য ‘নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মাদকের প্রভাবে অন্যায় করে ফেলেছে কিংবা যা হয়েছে তা সম্মতির ভিত্তিতেই হয়েছে’, এরকম অনেক হাইপোথিসিস এখন বাজারে ছাড়া হবে। অথচ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, ধর্ষণের পুরো ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জন্মদিনের পার্টির জমজমাট আয়োজনের মিথ্যা গল্প সাজানো হয়েছিল এবং হোটেলে আগে থেকেই রুম বুক করা ছিল।

ঘটনার সঙ্গে রেইন ট্রি হোটেলের কারও জড়িত থাকাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ধর্ষণ-নির্যাতনকালীন সময় হোটেলের বেয়ারারা এসে মাঝেমধ্যে খোঁজ নিয়ে গেছে। তরুণীরা প্রাণপণে চিৎকার করে রক্ষা পেতে চেয়েছেন। অথচ পুলিশ ডাকা তো দূরের কথা, হোটেলের কেউ তাদের রক্ষায় সামান্য উদ্যোগ নেয়নি। এসব নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার।

ধর্ষক গংয়ের ঔদ্ধত্য দেখেও অবাক লাগে। ওদের মধ্যে কোনো রকম অনুতাপ দেখা যায়নি। বরং নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা তরুণীদ্বয়ের জীবন আরও অসহনীয় করে তুলেছিল। মামলার পরেও থেমে যায়নি ওরা। বরং টাকার জোরে সবকিছু ম্যানেজ করতে চেয়েছে। ইতোমধ্যেই আমরা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ধর্ষকদের দেশত্যাগের বিভ্রান্তিমূলক খবর পেয়েছিলাম। অথচ তারা দেশেই ছিল। সিলেট থেকে দুজন আসামি গ্রেফতার হয়েছে।

ধর্ষণের এই ঘটনার শুরুতে বনানী থানার কতিপয় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। পুলিশ কেন এমন করে? কীসের প্রভাবে? কাকে রক্ষা করার জন্য? দূর থেকে শুনেছি, ঘটনা চাপা দেওয়ার জন্য নাকি ঢাকা শহরে প্রচুর টাকা উড়েছে। কিন্তু জনমত যেভাবে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করছিল, তাতে টাকায় কুল রক্ষা হত না।

সরকার এবং পুলিশ বিভাগকে ধন্যবাদ। কিছুটা দেরিতে হলেও তারা জনগনের নাড়ি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করব বাকি তিন আসামিও দ্রুত গ্রেফতার হবে। আমরা সবাই চাই, অভিযুক্ত ধর্ষক ও তাদের সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।