| |

মে দিবসের সেকাল, এ কাল

সাইফ বরকতুল্লাহ : ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। প্রতি বছরই দিনটি বিভিন্ন দেশে পালিত হয়। দিনটি এলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনচিত্র। কিন্তু দিবসটির মূল যে চেতনা সেটি আজও উপেক্ষিত।
বাংলাদেশের শ্রম আইনে দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও অন্তত ৮০ শতাংশ শ্রমিককে তার বেশি সময় কাজ করানো হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) গত ৩০ এপ্রিল (২০১৭) এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ  করে।  প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দূরপাল্লার পরিবহন খাতের শতভাগ শ্রমিকই দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। এ ছাড়া রি-রোলিং এর ৯২ ভাগ, হোটেলের ৯৮ ভাগ, হাসপাতালের ৪২ ভাগ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ৮০ ভাগ শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। এসব শ্রমিকরা সাপ্তাহিক ছুটি থেকেও বঞ্চিত হন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের ৬৬ ভাগ সাপ্তাহিক ছুটি পান না, ৮৮ ভাগ মে দিবসে ও ৮৬ ভাগ সরকারি ছুটির দিনে ছুটি পান না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

১৮৮৬ সালের পহেলা মের ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে অনেকটা বছর। কিন্তু পৃথিবীতে শ্রমিকদের অধিকার কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজ এ প্রশ্ন সবার? আমরা যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখবো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানাভাবে নানা মাত্রায় শ্রমিকরা এখনো শোষিত বঞ্চিত। ন্যূনতম অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকরা  এখনো লড়াই-সংগ্রামে ব্যস্ত। বাংলাদেশের গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পের দিকে নজর দিলে উপলব্ধি করা যায় এখানে শ্রমিকরা কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চনার কারণে প্রায়ই গার্মেন্টস শিল্পে ধর্মঘট, জ্বালাও-পোড়াও ও ভাঙচুরের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।

তবে সব গার্মেন্টস শিল্পের চিত্র এক রকম নয়। এখানে বঞ্চনার চিত্র যেমন আছে, তেমনি আছে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার চিত্রও। আর শ্রমিকদের বঞ্চনার জন্য কোনো কোনো মালিক যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী শ্রমিক নেতাও। আবার দেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিরুদ্ধে রয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রও। এসব নানা কারণে দেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিক ও মালিকের স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে।

তবে এ কথাও সত্য যে শ্রমিকদের মজুরি, কর্মঘণ্টা, কাজের পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে মে দিবসের পথ ধরেই। উন্নত গণতান্ত্রিক দশগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়েছে। শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কেও মালিকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিল্প ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের কারণে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বেড়েছে, জনজীবনে এসেছে গতিশীলতা। কিন্তু এর পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান, সেই শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি একইভাবে ঘটেনি। বিশেষত, তৈরি পোশাকশিল্প ও ইমারত নির্মাণশ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা যায়নি। অন্যান্য শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারও সর্বক্ষেত্রে স্বীকৃতি পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত হয়ে গঠনমূলক চরিত্র হারিয়েছে। কৃষিশ্রমিক, গৃহশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালকসহ বহু খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের শ্রমিকের স্বীকৃতি মেলেনি। নারী ও শিশুশ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। উন্নয়নের স্বার্থেই শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আমরা জানি, রানা প্লাজা হতাহত শ্রমিকদের অনেকেই তাদের ক্ষতিপূরণ পায়নি। এমনকি নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা শত চেষ্টা করেও খোঁজ কিংবা নিহত শ্রমিকের লাশও পায়নি। এই ভবন ধসের ঘটনার অভিজ্ঞতা নিয়ে অনুরূপ ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়া দরকার। কারণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, চালের কল, চাতাল, চিংড়ি ঘের, ওষুধ শিল্প, পাটকল ও কৃষি কাজে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক কর্মরত। এখানেও প্রয়োজন মজুরি কাঠামো বা নির্ধারিত শ্রম ঘণ্টা। বিত্তবানদের যেমন প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, ঠিক একজন শ্রমিকেরও এসব প্রাপ্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ শ্রমিকরাই দেশের প্রাণ। তাই তাদের কাজের ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মহান মে দিবসের এই দিনে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে আসুন শপথ নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

সুত্র রাইজিংবিডি